|

আধুনিক, শিল্পসমৃদ্ধ ও মানবিক ভালুকা আমার স্বপ্ন

প্রকাশিতঃ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ২১, ২০২০

মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন:
আজকের এই আধুনিক শিল্পসমৃদ্ধ ভালুকার মানুষ একসময় কৃষি মৎস্য অনন্য কিছু কার্যপ্রণালীর মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতেন, শিক্ষার হার ছিল খুবই অপ্রতুল, যাতায়াত ব্যবস্থা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা গুলো ছিল খুবই সামান্য।

এমন অবস্থায় আমাদের ভৌগলিক অবস্থান ঢাকার নিকটবর্তী এবং ব্যবসায়িক বান্ধব হওয়ায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে, ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিক্ষার হার। পাশাপাশি উন্নতি হচ্ছে যাতায়াত চিকিৎসা সহ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো। আজকের এই আধুনিক ভালুকায় সবকিছুই যখন উন্নতির দিকে যাচ্ছে তখন সবচেয়ে বেশি যেটা মানুষের মধ্যে দিনের পর দিন লোপ পাচ্ছে সেটা হল মানবতা। সর্বক্ষেত্রে মানবিকতা অনুপস্থিত থাকার কারণে আমাদের সমাজে এক ধরনের অরাজকতা চলছে।

আমরা যখন অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অনুন্নত ছিলাম তখন আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ সংখ্যক লোক জন ছিল সহজ, সরল এবং মানবিক। আর আজকে যখন আমরা শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদেরকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছি তখন আমাদের মানসিকতা ক্রমেই অমানবিক হয়ে যাচ্ছে।

আমরা যদি লক্ষ্য করি –
শিক্ষাক্ষেত্রে:
আমরা যদি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লক্ষ্য করি তাহলে ছেলেমেয়েদের ব্যাপক প্রয়াস চোখে পড়ে। কিন্তু সুশিক্ষার জন্য কোন সু-ব্যবস্থা গড়ে ওঠে নাই। যেমন, আমার শুধু পুঁথিগত বিদ্যার উপরে জোর দিচ্ছি। কিন্তু আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কি দেখতে পাই। একটি ছেলে তার বাবা মার সাথে কিভাবে কথা বলবে, সে তার আত্মীয়দের সাথে কিভাবে কথা বলবে, কিভাবে সে প্রতিবেশীদের সাথে চলাফেরা করবে, মুরুব্বীদের দেখলে কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করবে, কিভাবে খাবে, ছোটদের কিভাবে ¯েœহ করবে এরকম প্রত্যেকটা বিষয়ে প্রত্যেকটা স্কুলে এবং কলেজ প্রতিষ্ঠান গুলোতে সেখানো হয়ে থাকে। প্রত্যেকটা ধর্মের মধ্যেই মানুষের জীবন ব্যবস্থাপনা দেওয়া আছে আর সেই বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে শেখানো উচিত। কিন্তু আমরা কি দেখি শিক্ষা নিয়ে ব্যপক প্রতিযোগীতা কিন্তু সু-শিক্ষার উপস্থিতি খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। আর এজন্যেই মানবিকতা অনেকাংশে অনুপস্থিত আমাদের সমাজে।

চিকিৎসা:
আমাদের ভালুকা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা অরাজকতার একটি প্রতিচ্ছবি। আপনারা খেয়াল করলে দেখতে পারবেন। ডিগ্রি বিহীন অনেক ডাক্তার আমাদের ভালুকায় চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। লাইসেন্সবিহীন অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার যাতে চিকিৎসার নামে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। আমাদের সমাজের যারা গরিব মানুষ তাদের জন্য সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অপ্রতুল। কিন্তু খেয়াল করবেন আমাদের এই ভালুকাতে অনেক সুশিক্ষিত এবং বড় মাপের ডাক্তার রয়েছেন। যাদের মানবিকতা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। আমাদের এইসব মানবিক বিষয়গুলো প্রত্যেকে তার নৈতিক দায়িত্ব থেকে পালন করা উচিত।

বাসস্থান:
আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই। ভালুকা শিল্প সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অনেক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে। পাশাপাশি আমরা এটাও দেখতে পাই একটি বড় অংশ এখনো উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। তাদের নিজেদের বাসস্থান এখনো অপ্রতুল। আমরা সহ যাদেরকে মহান আল্লাহতালা স্বচ্ছতা দান করেছেন এবং বর্তমান ভালুকায় যারা নেতৃত্বে আছেন তাদের কার্যক্রম এই বিষয়ে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। যা সমাজের মানবিকতা প্রকাশ পায় না। অন্যদিকে যাদের মহান আল্লাহ স্বচ্ছতা দান করেছেন তারা যেসব বাসস্থান তৈরি করছেন তা অনেকাংশেই নিয়ম কানুন না মেনে করছেন। আর এসব ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের কষ্ট হবে, পরিবেশ দূষণ হতে পারে, সামাজিকতা নষ্ট হতে পারে এইসব বিষয় কে খুব বেশি একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে প্রথাটা একটা মানবিক সমাজে স্থান পেতে পারে না।

বস্ত্র:
আমরা উপরের কথাগুলো লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারি যে, আমাদের ভালুকায় যারা এখনও বস্ত্রের অভাব অনুভব করেন তাদের জন্য এই সমাজের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল আমরা কেউ আমাদের প্রতিবেশীদের হক সঠিকভাবে পালন করছি না। আমরা আমাদের প্রত্যেকের জায়গা থেকে নূন্যতম দায়বন্ধতা এবং নৈতিকতা থেকে যদি প্রতিবেশীদের হক পালন করি তাহলে এই কষ্ট থেকে ভালুকার প্রত্যেকটি মানুষ পরিত্রাণ পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সবাই একটু অন্তরিক হলেই একটি সমাজকে মানবিক ভাবে গড়ে তোলা সম্ভব।

অর্থনীতি:
আমাদের ভালুকায় লক্ষ্য করলে দেখা যায় অর্থের একটা অসম প্রতিযোগিতা চলছে যেখানে নিয়ম অনিয়ম কোনটাই মানা হয় না। আমরা কিভাবে অর্থবান হব এবং তা স্বল্প সময়ের মধ্যে হব তার জন্য নৈতিকতা ও মানবিকতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
পাশাপাশি লক্ষ করা যায় যে, কেউ যদি অর্থনৈতিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করছে এমন লোকদেরকে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করা যায় তাদের জন্য এক শ্রেনীর লোকজন কাজ করছে। অর্থ যেকোনো মূল্যে অর্জন করাকেই মনে করা হচ্ছে সফলতা। এক সময় সমাজে সুশিক্ষিত, জ্ঞানী, গুণীজন ও সততা কে মূল্যায়ন করা হতো। আর এখন অর্থনৈতিক ভাবে সফল ব্যাক্তিদের কে সমাজে মূল্যায়ন করা হয়। সেইটা যে কোন উপায়ে হোক না কেন, এমন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যার ফলে সমাজে সৎ ও গুণীজনদের মূল্যায়ন দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে।

অপসংস্কৃতি:
আমরা প্রায়শই খেয়াল করি আমাদের এই ভালুকায় অপসংস্কৃতি সর্বত্রই গ্রাস করছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমাদের ভালুকায় সামাজিক মূল্যবোধ এবং আচার-আচরন দায়বদ্ধতা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। আমরা বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও ছোটদের কে ¯েœহ করছিনা। এবংকি সঠিক পরামর্শটুকুও দিচ্ছি না। ক্রমশই আমাদের সমাজে এক ধরনের উগ্র এবং বেয়াদবির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রায় আমাদের ভালুকায় বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য অনেক অনুষ্ঠান হয় যেখানে প্রতিবেশী বা অন্যদের কথা ভাবা হয় না। এর মাধ্যমেই যে একজন অসুস্থ প্রতিবেশী, ছাত্র/ছাত্রী বা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা আমরা ভাবিনা। ভালুকায় সঠিক সংস্কৃতির চর্চার অভাবে সর্বত্রই অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেমন- অবাধ মাদকদ্রব্য গ্রহন, মাদকাসক্ত বৃদ্ধি, জুয়া, ইভটিজিং, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি এইগুলো ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং আমাদের সমাজকে যদি অপসংস্কৃতি মুক্ত করতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে মূল্যবোধ, মানবিক দায়বদ্ধতা সর্ম্পকে সচেতন করতে হবে।

রাজনীতি:
আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই। আমাদের ভালুকায় প্রাই প্রত্যেককেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন। আমাদের মধ্যে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, সকলক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ করা। আমরা ভুলে যাই প্রথমত আমরা মানুষ তারপর আমরা সামাজিক জীব। কিন্তু আমাদের আচরণ দেখলে মনে হয় রাজনীতি আমাদের সবকিছু। আমাদের মনে রাখতে হবে সামাজিক ও মানবিক জীব হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি কোন কিছুর বিনিময়ে নেতা হওয়া যায়, যার মাধ্যমে সমাজে কর্তৃত্ব স্থাপন করা যায়। মনে রাখতে হবে সম্মান ও নেতৃত্ব মহান আল্লাহতালা দিয়ে থাকেন। যা মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে।

পরিশেষে বলতে চাই, আপনারা আমার মতামত বা লিখাটা দয়া করে অন্য ভাবে নিবেন না। এটা একান্তই আমার নিজস্ব মতামত কোন ধরনের ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দন দৃষ্টিতে দেখবেন।

লেখক: তরুণ শিল্পপতি ও সমাজসেবক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সুপ্তি সুয়েটার্স লি:
ভালুকা, ময়মনসিংহ।

Print Friendly, PDF & Email