|

মেয়র আনিসুল হকের হাতে নেওয়া সেই কাজগুলো এখন……….

প্রকাশিতঃ 2:39 am | May 29, 2018

জয়শ্রী ভাদুড়ী: জমি না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া ঢাকার সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প। শুধু এই প্রকল্প নয়, উচ্ছেদ করা তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড দখলে নিচ্ছে পুরনো দখলদাররা। উন্নয়ন প্রকল্প আর সবুজায়ন কর্মসূচি নিয়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)।

নগরবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, নগর সরকারের বিকল্প নগর সরকারই। সিটি করপোরেশনের ভিতরের জায়গায় ইউটার্ন করার জন্য যদি অন্য প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বা টাকা দিয়ে জায়গা কিনতে হয়- এর চেয়ে দুর্দশার আর কিছু হতে পারে না। ৩৪ লাখ মানুষের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়। অথচ খাজনা তোলা আর শহর ঝাড়ু দেওয়া ছাড়া তার কোনো অধিকার নেই। ৫৪টি সেবা সংস্থা আর ৭টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কোনো মেয়রেরই শহরের উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, আনিসুল হকের নেওয়া প্রকল্পগুলো তার ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়। এ শহরের মানুষের দুর্দশা লাঘব করে জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য। তাই এ প্রকল্পগুলো নিয়মিত তদারক করতে হবে এবং মেয়াদের মধ্যে শেষ করতে হবে। অনিশ্চয়তায় ইউটার্ন প্রকল্প : জমি না পাওয়ায় অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্প। ঢাকার যানজট কমাতে হাতে নেওয়া এ প্রকল্পে র‌্যাব-১ অফিস এবং রাজলক্ষ্মী বাদে বাকি ইউটার্নগুলোর কাজ বন্ধ রয়েছে। এ প্রকল্প আর এগোবে কিনা তা নিয়েই এখন সন্দিহান এর উদ্যোক্তা ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

সাতরাস্তা, তেজগাঁও, মহাখালী এবং বনানী এলাকায় দেখা গেছে, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। এসব জায়গায় প্রকল্পের সাইনবোর্ড থাকলেও কোনো শ্রমিক বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। শুধু উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনে এবং রাজলক্ষ্মী এলাকায় দুটি নির্মাণ কাজ চলছে। দুই বছর আগে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের এই উদ্যোগ নেন উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। সাতরাস্তা, কোহিনূর কেমিক্যাল মোড়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী ফ্লাইওভার, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, বনানী কবরস্থান, বনানী ওভারপাস, শ্যাওড়া, কাওলা, উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনের সড়ক এবং জসীমউদ্দীন সড়কের সামনে এই ইউটার্নগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।

সিটি করপোরেশনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ১ দশমিক ৩৬ একর, বাংলাদেশ রেলওয়ের দশমিক ২২ একর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের দশমিক শূন্য ৯ একর এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের দশমিক শূন্য ৬ একর জমি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে। এ প্রকল্পের ব্যয়ের ২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে ১৯ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারের দেওয়ার কথা। আর বাকি ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানোর কথা। এসব ইউটার্ন নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের শেষ দিকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠায় উত্তর সিটি করপোরেশন। সেখানে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও অনুমোদন পেতেই গত বছরের ২৭ মার্চ পেরিয়ে যায়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত ২৯ অক্টোবর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এসএম কনস্ট্রাকশনসকে কার্যাদেশ দেয় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। নভেম্বরের শুরুতে ঠিকাদার কাজ শুরু করলেও জমি না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি প্রকল্পটির। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘সড়ক ও জনপথের কাছ থেকে এখনো জমি বুঝে পাইনি। মেয়র আনিসুল হক থাকতে তারা আমাদের বলেছিলেন, তাদের জমি আমরা ব্যবহার করতে পারব। কিন্তু এখন সড়ক ও জনপথ বলছে, জমি কিনে নিতে হবে। ফলে পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।’

দখল হয়ে যাচ্ছে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড : তেজগাঁও সাতরাস্তার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দখল করে তৈরি করা হয়েছিল ট্রাকস্ট্যান্ড। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেয়র আনিসুল হক সেটি উচ্ছেদ করেছিলেন। কিন্তু এখন ভূমি ও জরিপ অধিদফতরের সামনের সড়কজুড়ে আবার ট্রাক রাখা হচ্ছে। সাতরাস্তা মোড়ে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানির উল্টোদিকে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনে এবং রেলক্রসিংয়ের আগে সড়কের পাশে এক সারি করে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। সাতরাস্তা দখলমুক্ত রাখতে প্যানেল মেয়র ওসমান গণি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। শুধু তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড নয়, দখল হয়ে যাচ্ছে রাজধানীর ফুটপাথগুলোও। উত্তর সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরের দিনই নির্ধারিত জায়গায় বসে যাচ্ছে হকাররা।

থমকে গেছে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম : ‘গ্রিন ঢাকা ক্লিন ঢাকা’ ক্যাম্পেইন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেয়র আনিসুল হক। এ জন্য একদিকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, অন্যদিকে গাছ লাগিয়ে সবুজ নগরী তৈরিতে কাজ করছিলেন তিনি। তিন বছরে ৫ লাখ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়ে ২০১৬ সালের মে মাসে ‘সবুজ ঢাকা’ প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু মেয়রের মৃত্যুতে থমকে গেছে এ কার্যক্রম। মেয়র ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন প্রকল্পটি। এখন এই প্রকল্পের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

মোনায়েম খানের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা জায়গা : স্বাধীনতাবিরোধী মোনায়েম খানের পরিবারের অবৈধ দখল থেকে ১৪ কাঠা জমি উদ্ধার করেছিল ডিএনসিসি। পাশের কবরস্থানের সঙ্গে মিল রেখে ওই জায়গায় একটি পার্কের নকশা করা হয়েছিল। এখন এ নিয়ে আলাদা কোনো প্রকল্প আর ডিএনসিসিতে নেই।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে চার হাজার বাস নামানোর সিদ্ধান্ত : গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির মাধ্যমে চার হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা করেছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। সে অনুযায়ী পরিবহন কোম্পানি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাও করেছিলেন বেশ কয়েকটি। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে প্রকল্পটি।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্লান্ট নির্মাণ : বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা শুরু থেকেই ছিল আনিসুল হকের। সে অনুযায়ী চীনের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শনও করেছিলেন তিনি। গাবতলীতে অবৈধ দখলে থাকা ৫২ একর জমি গত বছর উদ্ধার করে ডিএনসিসি। এখানে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্লান্ট, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ, বাস, ট্রাক ডিপোসহ কিছু স্থাপনা করার পরিকল্পনা ছিল। এখনো এসব প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সিটি করপোরেশন।

এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা : রাস্তায় প্রয়োজনীয় আলো ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে এলইডি বাতি ও সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রকল্প নিয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র। ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদনও পায় একনেকে। মেয়র মারা যাওয়ার পর এই প্রকল্প বিভক্ত হয়ে গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সাত হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় নগরে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ডিএনসিসি এখন শুধু এলইডি বাতির কাজ করবে। এসব ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ইউটার্ন নির্মাণের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আনিসুল হক চেয়েছিলেন উন্নত মানের বাতি লাগাতে। তাই ডিএনসিসি জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বাতি কিনবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় এলইডি বাতি লাগানো হবে। সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন