ভালুকায় হাজার হাজার ‘ক্ষুদে বঙ্গবন্ধু’ তৈরির কারিগর কামরুল তালুকদার
প্রকাশিতঃ ৬:৫৪ অপরাহ্ণ | মার্চ ১০, ২০২০
এম.এ মালেক খান উজ্জল, ভালুকার খবর: সারাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক কালজয়ী ১৮ মিনিটের সেই ভাষণটি কতজনের মুখস্ত রয়েছে, তা জানা না থাকলেও ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের চারশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হজার কোমলমতি শিক্ষার্থী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি মুখস্থ্য বলতে পারেন। শুধু মুখস্থ্য বলতে পারা নয়, জাতির পিতা ১৮ মিনিটের ভাষনটি প্রদানের সময় কখন কি কি অঙ্গভঙ্গি করে ছিলেন, ভালুকার ঘরে ঘরে সৃষ্টি হওয়া হাজার হাজার “ক্ষুদে বঙ্গবন্ধু”রা তা হুবুহু করতে শিখেছেন। হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জাতির পিতার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের চেতনায় উজ্জীবিত করার কারিগড়, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার। বর্তমানে তিনি পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে উপ সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
জাতির পিতার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণই ছিল বাঙালির জেগে উঠার একমাত্র মন্ত্র এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল অনুপ্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে ৭ই মার্চের কালজয়ী জেগে উঠার মন্ত্রকে ছাত্র-ছাত্রীসহ তরুন প্রজন্মের অন্তরে স্থায়ীভাবে গ্রথিত করার গুরুত্বের উপলব্ধি থেকেই দেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার এই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে “জাতীয় ভাষণ” এবং এই দিনটিকে “জাতীয় ভাষণ দিবস” হিসেবে ঘোষণার জন্য ২০১৭ খ্রিষ্ট্রাব্দের ২৫ জানুয়ারী ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি অনুরোধ পত্র প্রেরণ করেন।
উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর “মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টার্ন্যনাল রেজিস্টার” এ অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে “ বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের” স্বীকিৃত প্রদানের ৯ মাস পূর্বেই মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে “জাতীয় ভাষণ” এবং ৭ই মার্চকে “জাতীয় ভাষণ দিবস” হিসেবে ঘোষণার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি অনুরোধ পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
ওই অনুরোধ পত্র প্রেরণের পর তৎকালিন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জনাব আলহাজ মোঃ গোলাম মোস্তফা প্রধান উপদেষ্টা, উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম পিন্টু ও উপজেলা পরিষদ মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মনিরা সুলতানা মনিকে উপদেষ্টা করে একটি উপদেষ্টা পরিষদ ও তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল জাকির, উপজেলা শিক্ষা অফিসার জনাব মোঃ শহীদুজ্জামান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব মোঃ সাইফুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সমন্বয়ে বিচারক প্যানেল গঠন করে শুরু করেন ভাষণ প্রতিযোগীতা। ২০১৭ খ্রিষ্ট্রাব্দের জানুয়ারী মাসে ভালুকার সাবেক ইউএনও মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার ৭ই মার্চের ভাষণের উপর উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের চার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অংশ গ্রহনের মাধ্যমে শুরু করেন ভাষণ উৎসব। এর জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষণের প্রায় ১২০০ কপি সিডি এবং প্রিন্ট কপিও বিতরণ করেন তিনি। এরপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করেন ২০১৭ খ্রিষ্ট্রাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসের মাসব্যাপী ভাষণ প্রতিযোগিতার। প্রথমে নিজ স্কুলে ও পরে ইউনিয়ন ভিত্তিক সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা চলে। চারটি বিভাগে উপজেলার সেরা ভাষণদাতা হিসেবে ১২ জনকে চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত করা হয়। তাঁর এই চেতনার সাথে তখন পুরো ভালুকাবাসী একাট্টা হয়ে কাজ করেছেন। সকলের সহযোগিতায় ভাষণ প্রতিযোগিতা পরিনত হয় ভাষণ উৎসবে। ২০১৭ খ্রিষ্ট্রাব্দের ৭ই মার্চ ভালুকা ডিগ্রি কলেজ মাঠে শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিবাবক ও ভালুকাবাসীর সমন্বয়ে দুই লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটানোর উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। ব্যতিক্রমী ওই অনুষ্ঠানে দেশ পরিচালনার নীতি নির্ধারকের দায়িত্ব পালনকারী কোন ব্যক্তির উপস্থিতিতে চারটি পর্যায়ের ১২ জন প্রতিযোগীকে ভাষন প্রদান করানো হবে এবং এদেরকে ওই অভাবনীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরস্কার প্রদান করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু ৭ই মার্চের আগেই ইউএনও মোঃ কামরুল আহসানের বদলির আদেশ হওয়াতে সকলেই ব্যথিত হন। এতে উপজেলার ঘরে ঘরে চলে আসা কোমলমতি শিশুদের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মুখস্থ করে জাতির জনকের মতো অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়ে উচ্চারণ করা এবং মুজিব কোট পরে বঙ্গবন্ধু সাজার চেষ্টা করে আসা শিশুসহ জনমনে নেমে আসে চরম হতাশা। ইউএনও মোঃ কামরুল আহসান তালুকদারের বদলির আদেশ হওয়ার পর ৭ই মার্চ ভালুকা ডিগ্রি কলেজ মাঠের বিশাল আয়োজনের কর্মসুচী স্থগিত করা হলেও ভাষন উৎসব স্থগিত হয়নি। এমনকি ২০১৭ খ্রিষ্ট্রাব্দের ৭ই মার্চ তারিখে ভালুকা থেকে বদলি হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে যোগদান করার পরও ভাষণ উৎসবটি নিয়ে তাঁর তৎপরতার কোন কমতি ছিল না। পরবর্তীতে উপদেষ্টা ও বিচারক প্যানেলের জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাগণ ভাষণ উৎসবে চুড়ান্ত বিজয়ীদের মাঝে সনদ ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
মো. কামরুল আহসান তালুকদার কর্তৃক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্ভাবনী ভাষণ প্রতিযোগীতা নিয়ে তার গৃহীত বিশাল কর্মসুচীর বিষয়টি সরকারী উচ্চ পর্যায়ের একটি টীম সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই পূর্বক তাকে জাতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ খ্রিঃ এ মনোনিত করা হয়। ২৩ জুলাই ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মোঃ কামরুল আহসান তালুকদারকে জাতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে জনপ্রশাসন পদক হিসেবে ক্র্যাষ্ট, সনদ ও চেক প্রদানের মাধ্যমে জনপ্রশাসন পদকে ভ’ষিত করেন।
ওই ভাষণ প্রতিযোগীতারটি ৩ বছর পূর্বে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি চর্চার ব্যাপারে কোন সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ কোন উদ্যোগ গ্রহন করেননি। তবে চলমান মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে ভালুকা উপজেলা প্রশাসন গত ৭ই মার্চ ২০২০খ্রিঃ শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহনের মাধ্যমে ভাষণ প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছিলেন। তবে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক চর্চার ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার জোর দাবী জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক পর্যায়ে উপজেলার প্রথম স্থান অধিকারী হালিমুন্নেছা চৌধুরানী মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ের তৎকালিন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, সরকারী মুমেনুননেছা কলেজ, ময়মনসিংহের প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত রাজিয়া সুলতানা জানান, ‘বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতাম না। ভাষণটি শেখার মাধ্যমে অনেক কিছুই জেনেছি। কিভাবে তিনি আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন এবং অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। এখন ছোট ভাই-বোনদের ভাষণটি শেখাচ্ছি, প্রতিবেশী শিশুদেরও শোনাই।
হালিমুন্নেছা মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আনোয়ারা নীনা বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২০০। প্রতিটি ক্লাসেই ভাষণ নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়েছে। তখন আমার স্কুলের চারশতাধিক শিক্ষার্থী বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মুখস্থ করেছিল। ২০১৭ খ্রিঃ পরে আমরা নিজেরা প্রতিটি ক্লাশেই নিয়মিত ভাষন প্রতিযোগিতা চালিয়ে আসছি। ভাষণ উৎসবের পর স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকারী কর্মকর্তাগণ এনিয়ে কোন উৎসাহ দেখাননি। সরকারী ভাবে পৃষ্টপোষকতা থাকলে বিষয়টি ধারাবাহিকতা থাকতো। এখনও আমার স্কুলের প্রায় একশত শিক্ষার্থী ভাষণটি মুখস্থ্য বলতে পারে। তিনি সরকারী ভাবে এ ভাষণ চর্চার উদ্যোগ গ্রহনের দাবী জানান।
ভালুকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশেক উল্যাহ চৌধুরী জানান, এ প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার জন্য তৎকালীন সময় আমার প্রতিষ্ঠানে একটি সিডি থেকে প্রায় দুই হাজার কপি করে শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই কমবেশি মুখস্থ বলতে পারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ।
ভালুকা উপজেলা পরিসদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম মোস্তফা বলেন, ভালুকার সাবেক ইউএনও কামরুল আহসান তালুকদার যখন এ ব্যতিক্রর্মী ভাষন উৎসবের পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, তখন আমি তার দূরদর্শীতায় বিস্মিত হয়েছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে উদ্যোগটি উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিবাবকদের মাঝে উৎসবে পরিনত হয়েছিল। আমার উপজেলায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিশুরা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ মুখস্থ্য বলতে পারে দেখে সত্যিই গর্ববোধ হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত এসব শিশুই আগামী দিনে নেতৃত্বে আসবে।
জাতীয় পর্যায়ে এই ভাষণের স্বীকৃতির জন্য যার এত আকুলতা, যিনি জাগাতে জানেন, সেই নেপথ্যের কারিগড় সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের উপ সচিব মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শেখানোর উদ্যোগ গ্রহন করেছিলাম। তাঁর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বোপরি স্বাধীনতার সব উপাদান একসঙ্গে গাঁথা। এ জন্যই বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘পয়েট অব পলিটিকস’। তিনি আরোও বলেন, ‘ভাষণটি শিশুরা নিজের মধ্যে ধারণ করলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারবে বঙ্গবন্ধু ভাষণটি কেন দিয়েছিলেন। ভালুকা উপজেলার কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এ ভাষণটি মুখস্থ বলতে পারে এবং একই সঙ্গে তারা জেনেছে যে কেন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আমার অনুরোধ, সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালুকার মতো দেশের সর্বত্রই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চর্চার জন্য সরকারী ভাবে প্রদক্ষেপ গ্রহন করা হোক।


