|

ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় অনিবার্য

প্রকাশিতঃ ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ | অক্টোবর ২৫, ২০১৮

মাহমুদ আজহার ও শাহ দিদার আলম নবেল, সিলেট থেকে: সাত দফা দাবি নিয়ে সরকারকে সংলাপ সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অন্যথায় রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়েরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট। নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তফসিলের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরে যেতে হবে। ভেঙে দিতে হবে সংসদ। মুক্তি দিতে হবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ সব বন্দীদের। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নেতারা বলেন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে একঘরে করা হবে। এর মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি আদায় করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

গতকাল পুণ্যভূমি সিলেটের রেজিস্ট্রারি মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত এক জনসভায় শীর্ষ নেতারা এ আহ্বান জানান। সবার বক্তব্যেই ঘুরে ফিরে উঠে আসে সাত দফার আলোকে সংলাপ সমঝোতায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা। আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও ছিল নেতাদের বক্তব্যে। বেলা ২টায় জনসভার কার্যক্রম শুরু হলেও দুপুরের আগেই রেজিস্ট্রারি মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জনসভায় গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে হলে, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে হলে, জনগণ ক্ষমতার মালিকানা ফিরিয়ে আনতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবাইকে মাঠে নামতে হবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, ঐক্যফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ হউন। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। বাংলাদেশের জনগণের জয় হবেই। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আবার দেশের মালিক হব, এই রাষ্ট্র আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনব।’ জনসভা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান ড. কামাল হোসেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের সাত দফা দাবি তুলে ধরে জনসভায় প্রধান বক্তা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা, আমাদের লক্ষ্য মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র নির্মাণ করা। আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। আজকে সরকারের শত বাধা-প্রতিবন্ধকতার পরও সারা সিলেট থেকে মানুষ ছুটে এসেছে এই জনসভায়। তারা প্রমাণ করেছে, তারা গণতন্ত্র ফিরে পেতে চায়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই আমরা আমাদের অধিকারকে ফিরিয়ে আনব।’ নগরীর রেজিস্ট্রি মাঠে বুধবার বেলা ২টার দিকে কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। জনসভায় যাওয়ার আগে হজরত শাহজালাল ও শাহ পরানের মাজার জিয়ারত করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এর আগে জনসভার স্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে কোর্ট পয়েন্টে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ উন্নয়নের প্রচারপত্র বিলি করে। তবে মঙ্গলবার রাতে নগরীর একটি হোটেলের সামনে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদকে লাঞ্ছিত করা হয়। অভিযোগের তীর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। এদিকে গতকাল জনসভা শেষে ফেরার পথে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সন্ধ্যা ৬টার দিকে জনসভা শেষে নেতাদের সঙ্গে শহরের রোজ ভিউ হোটেলে যাওয়ার পর সেখান থেকে বেরোনোর পরপরই তাকে পুলিশ আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। গ্রেফতারের খবর শোনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের কাছে এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি জানান। মঙ্গলবার রাত থেকেই নেতা-কর্মীদের বাড়িঘরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হানা দিয়ে ৩৬ জনকে আটক করে বলে অভিযোগ করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আজমল বখত সাদেক। তিনি বলেন, জনসভায় যোগ দিতে আসা নেতা-কর্মীদের সিলেটের তিনটি পয়েন্ট শাহপরান মাজার গেট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও মৌলভীবাজারের শেরপুরে গাড়িতে পুলিশ তল্লাশি চালায়। এসব স্থানে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা থেকে আসা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক শিকদার বলেন, তিন জায়গায় তারা তল্লাশির মুখে পড়েন। পরে ভিন্ন পরিচয়ে সিলেটে জনসভায় যোগ দেন তিনি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, ঢাকা থেকে আসার পথে তার বহর থেকে একটি গাড়ি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থানায় নিয়ে যায়। আয়োজক নেতারা বলেন, এসব বাধা উপেক্ষা করে জনসভা করতে হয়েছে। জনসভা মাঠ ছাড়িয়ে সামনের মূল সড়ক সুরমা পয়েন্ট থেকে তালতলা মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। এ সময় আশপাশের এলাকায় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

জনসভায় মঞ্চের পশ্চিম দিকে রেজিস্ট্রারি ভবনে টানানো হয়েছে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রায় বাতিলের দাবি সংবলিত বেশ কিছু ডিজিটাল ব্যানার। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সদ্য গ্রেফতার হওয়া ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, নিখোঁজ সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলীর ছবি সংবলিত ব্যানারও ছিল।

জনসভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে একটি ‘ব্যতিক্রমী’ প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৪ নভেম্বর আমরা তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় নেতাদের মাজার জিয়ারত করতে পারি। সেখানে আরাফাত রহমান কোকোর কবরও জিয়ারত করতে পারি। এরপর চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করব। ধানমন্ডিতেও যাব। সেখানে বঙ্গবন্ধুর মাজারও জিয়ারত করব।’ একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আস্থা রাখতে চান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আমরা বিশ্বাস করতে চাই।’ জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী এদেশের মালিক জনগণ। জনগণকে এই মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। মালিকানা যদি পুনরুদ্ধার করতে হয় তাহলে জনগণের ঐক্য অপরিহার্য। এ জন্য ঐক্য লাগবে। দলীয় ঐক্য নয়, জাতীয় ঐক্য। তাই আজকে সবাইকে সংগঠিত হতে হবে। সবাইকে এক হয়ে বলতে হবে আমরা দেশের মালিক। আমাদেরকে মালিকানা ফিরে পেতে হলে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। ড. কামাল বলেন, সাত দফাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করুন। এটিকে হালকাভাবে নেবেন না। এই যাত্রায় জনগণ সাড়া দিয়েছে। অবশ্যই জনগণের মালিকানা এবার ফিরে পাবে।’

প্রধান বক্তা হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হজরত শাহজালাল ও হজরত শাহ পরানের পুণ্যভূমি সিলেট থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হলো। এটি এক ইতিহাস রচিত হয়েছে এই পুণ্যভূমিতে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে। জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, দেশ ডাকাতের হাতে পড়েছে। আপনারা কি দাবি আদায় করতে চান? তাহলে সরকারের উসকানিতে পা দেবেন না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে হবে। গত তিন দিনে অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। আর কোনো নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হলে দেশবাসীকে নিয়ে রাস্তায় নামব। সাত দফা দাবি তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তফসিল ঘোষণার আগে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সিলেটের পুণ্যভূমি থেকে জাতীয় ঐক্যের নতুন যাত্রা শুরু হলো। দেশে একটি স্বৈরাচারী সরকার। তাদের অপসারণ করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। সাত দফা দাবি আদায়ে সরকারকে সমঝোতায় আসতে হবে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, কাঁঠাল দিয়ে যেমন আমস্বত্ত্ব হয় না, ঠিক তেমনই শেখ হাসিনাকে দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। দেশের মানুষ নির্ভিঘ্নে ভোট দিতে চায় কিন্তু নৌকায় নয়। আন্দোলনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করব। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব। তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনব। ড. মঈন খান বলেন, আজ দেশে গণতন্ত্র নিখোঁজ। জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার নেই। মানবাধিকারও নেই। আমরা গণতান্ত্রিক সব দলকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগকে একঘরে করে ফেলব। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আজ আমাদের শপথ নেওয়ার সময়। তাই বলতে চাই এবার কেউ ওয়াক ওভার নিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, সেটি কখনো পূরণ হবে না। ওয়াক ওভার নিয়ে কাউকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না। তাই আমাদের সবাইকে লড়াই করতে হবে।’

ড. কামাল হোসেনকে জাতীয় মুরব্বি উল্লেখ করে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘আজ আমরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। যতদিন বেঁচে থাকব জনগণের দাবির পক্ষেই থাকব। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি আদায়ে সোচ্চার থাকব।’ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আহমেদ ও মহানগরের নেতা আজমল বখত সাদেকের পরিচালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আমান উল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুর রহমান, খন্দকার আবদুল মোক্তাদিন, ফজলুল হক আসপিয়া, এনামুল হক চৌধুরী, এম এ হক, তাহমিনা রুশদি লুনা, খায়রুল কবির খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, জিন্নুর রশীদ চৌধুরী দিপু, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আ ব ম মোস্তফা আমিন, ২০-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের এম এ রকীব, খেলাফত মজলিশের আহমেদ আবদুল কাদের, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শাহীনুর পাশা চৌধুরী, সাবেক এমপি শাম্মী আক্তার, কলিমউদ্দিন আহমেদ মিলন, দিলদার হোসেন সেলিম, জিকে গউস, বিএনপির জেলা সভাপতি আবদুল কাহের চৌধুরী শামীম, সাধারণ সম্পাদক আলী আহমেদ, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকি প্রমুখ। জনসভায় বিকল্পধারা একাংশের মহাসচিব শাহ আহমেদ বাদল, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান, এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ।

সুত্র: বাংলাদেশপ্রতিদিন।

Print Friendly, PDF & Email